বাংলা নববর্ষে কৃষি
মো. বশিরুল ইসলাম: পহেলা বৈশাখ, বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসাবে পালিত হয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন প্রাণের উৎসব। এ দিনে বিশ্বের সকল প্রান্তের বাঙালিরা অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ। আর কালের বিবর্তনে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। বাঙালি এই প্রাণের উৎসবের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত আছে আবহমান বাংলার কৃষি।
এখন যেমন বাংলা নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল বিশেষ ঋতুনির্ভর। ফসল বোনা, ফসলের সময়ভিত্তিক যত্ন বা পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ যাবতীয় কৃষিকাজ বাংলা সন-তারিখ পঞ্জিকা অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা হতো। বাংলায় হরেক রকম মেলার দিন-তারিখও নির্ধারিত ছিল বাংলা সনের সঙ্গে। শুধু ফসল আর উৎসব নয়, বাঙালির কৃষকের পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্ম, বিবাহ, জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের সব বিষয়েই বাংলা সন ছিল একক ও অনন্য।
বাঙালির বাংলা সন যেমন ফসলি সন, তাদের জীবনেও ছিল ফসলের মৌসুমের উষ্ণতা, উচ্ছ্বলতা। বর্ষাকালে ধান-পাট কাটা হলে তা বিক্রি করে যে নগদ পয়সা হাতে আসত, তা দিয়েই বছরের নতুন কাপড় কেনা, খাজনার দেওয়ার পর কটা মাস অলস সময় কাটানো। শীতকালের আমন ধান ঘরে উঠলে আবার পিঠাপুলি খাওয়া নবান্ন উৎসব, নানা রকম মেলার আয়োজন, যাত্রা, কবিগান, জারি-সারি, রামায়ণ, গম্ভীরা, কীর্তন, পালার আসর, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠিখেলা, মেয়েদের গার্সি উৎসব, ছেলেদের দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বাণখেলা, হা-ডু-ডু খেলার জমজমাট আনন্দ-ফুর্তি। প্রাচীন সংস্কারমূলক বড় আকারের চৈত্রসংক্রান্তির মেলা, চড়ক উৎসব ও শত্রুনিধন ও দমনের জাদু বিশ্বাসজাত আচার এবং পহেলা বৈশাখের ভোরে কৃষক পরিবারের পারিবারিক 'আমানি উৎসব’। আমানি ছিল মেয়েলি উৎসব, এর লক্ষ্য ছিল পরিবারের কল্যাণ ও পারিবারিক কৃষির সমৃদ্ধি কামনামূলক। এই পারিবারিক উৎসবের আচার সম্পন্ন করতেন বাড়ির মহিলাকর্ত্রী। কৃষি আবিষ্কারে নারীর পথিকৃতের ভূমিকা এবং তারই ফলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের স্মৃতিচিহ্নবাহী বলে কেউ কেউ এ আচারমূলক অনুষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করেন।
ভারতবর্ষে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা তথা ফসলী সন ১৫৫৬ সালের ১৪ এপ্রিল প্রবর্তন করেন। তবে শুরুর দিন কিন্তু ১ সাল ছিল না, ছিল ৯৬৩ সাল। তখন এ দেশে হিজরী সাল প্রচলিত ছিল। হিজরী বছরটিকে ঠিক রেখেই নতুন একটি বর্ষপঞ্জি চালু করা হয়। বাংলা দিনপঞ্জীর সঙ্গে হিজরী ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুর হয় মধ্যরাতে। আর বাংলা সনের দিন শুরু হয় ভোরে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্তমান পরিচিত পান্তা খাওয়া বাঙ্গালীর পহেলা বৈশাখের উৎসব।
বঙ্গদেশে বাঙালি কৃষিজীবী মুসলমান সম্প্রদায় নানা দেশীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ আবাহন করেছেন। নববর্ষের অন্যান্য গ্রামীণ অনুষ্ঠান ও মেলা এখনো কিছু পরিমাণে চালু আছে, উদাহরণ হিসেবে (কুষ্টিয়া, নড়াইল ও কিশোরগঞ্জ),লাঠিখেলা বা কাঠি নাচ ষাঁড়ের লড়াই (কেন্দুয়া, নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চল), মোরগের লড়াই (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), গরুর দৌড় (মুন্সিগঞ্জ), হাডুডু খেলা (মানিকগঞ্জসহ অন্যান্য স্থানে) এবং সারা দেশে নানা রকমের মেলার নাম উল্লেখ করা যায়। এসব অনুষ্ঠান-উৎসব বা প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সার্বিক আনন্দের উৎস এবং ঐতিহ্যে অংশগ্রহণের উপযোগী মাধ্যম।
বাংলা সন ও বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির অবস্থান বর্তমান বাংলাদেশে আর আগের মতো নেই। এখন মানুষ লেখাপড়া শিখছে। গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে নানা উপাদান যুক্ত হয়ে নতুন গতিবেগ সঞ্চার হয়েছে এবং এতে অনেকের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, হাতে নগদ পয়সা আসার উৎস সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জীবনধারার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন ঘটেছে সামাজিক রীতিনীতি ও অভ্যাসের। এই পরিবর্তনের ফলে বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির উপাদান এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বাংলা সনও আর এখন একাধিপত্য করতে পারছে না। বরং গ্রাম-জীবনের নতুন ধারা বা শহরের বাস বা বিদেশে চাকরিবাকরির সুবাদে ইংরেজি সনের ব্যবহার বেড়েছে। এ অবস্থায় বাংলা সন ও বাঙালি সংস্কৃতি প্রচ- চাপের মধ্যে পড়েছে। এখন আর আগের মতো বাংলা দেয়াল পঞ্জিকা দেখা যায় না। ক্বচিৎ কখনো কৃষি ব্যাংকের পঞ্জিকায় রোমান ক্যালেন্ডারের অক্ষরের নিচে বাংলা সংখ্যাও লেখা থাকে। আসলে গ্রামবাংলা এখন এক ক্রান্তিকালের মুখে। পুরনো সংস্কৃতি ও জীবনধারা ভেঙে গেছে, কিন্তু নতুন সংস্কৃতির বুনিয়াদ পাকা হয়নি।
বাংলা নববর্ষেও ভেতর দিয়ে মূলত দেশের আপামর জনসাধারণ নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন করে চলেছে। পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্যদিয়ে এ দেশের নর-নারী এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নতুবা আমাদের নতুন প্রজন্ম বাংলার ঐতিহ্য লোক-সংস্কৃতির কিংবা বাংলা ঋতু কথা ভুলেই যেত!!!
**শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের সাময়িকী "কুঞ্জলতা" তে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই
মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।