Header Ads

Header ADS

সময়ের প্রেক্ষিতে

রাজীব: পৃথিবীটা বড়ই বিচিত্র স্থান। এখানে যা কিছুর প্রয়োজন তা নেই, আবার যা আছে হয়তো বা তার কোন প্রয়োজন নেই। পাটক্ষেতে নিড়ানি দিয়ে আগাছা বাছতে বাছতে কথাগুলো ভাবে করিম মিয়া। গ্রামের অশিক্ষিত চাষা শ্রেণীর লোকের মনে এমন চিন্তা আসার কথা নয়। কেন যে আসে? কেউ সম্পদের পাহাড় গড়েছে পক্ষান্তরে কেউ ক্ষুধা-দারিদ্রের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে অহরহ। সেই ছেলেবেলা থেকে হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে, সৎ জীবন যাপন করে কি পেল সে? না কিছু পায়নি সে কথা ঠিক না। তার সবচেয়ে বড় অর্জন, তার জীবনের মহামূল্যবান সম্পদ মানিক, তার ছেলে। ছেলের কথা মনে হতেই হঠাৎ বুকের বা পাশটা ধক করে ওঠে করিম মিয়ার। আজ না মানিকের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন। ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টিতে সামনের পথের দিকে তাকায়। হ্যাঁ, কে যেন আসছে। ঐ তো মানিক! 

বাজান! বুক জুড়ানো ডাক দিয়ে ছেলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফলাফলের খবরটা দেয় বাবাকে। সে এস.এস.সি. তে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। গোল্ডেন জিপিএ-৫ কি তা বোঝেনা মজিদ মিয়া। শুধু ছেলের হাসি ও উত্তেজনার বহর দেখে অনুমান করে ফলটা নিশ্চয় খুব ভালো।
আনন্দে উদ্বেলিত হয় করিম মিয়ার অন্তর। কিন্তু আনন্দে উদ্বেল হলেও তার পোড় খাওয়া মনে আবার দুশ্চিন্তা আসে এরপর মানিকে আরও লেখাপড়া শেখাবে কীভাবে? ফলাফলের আনন্দে কটাদিন বেশ কাটল। দেখতে দেখতে ভর্তিও সময় চলে এল। সিরাজ স্যারের পরামর্শে আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় বেশ কিছু ধারদেনা করে মানিককে ভর্তি করা হলশহরের নামকরা কলেজে, হোস্টেলে রাখা হলো লেখা পড়ার সুবিধার জন্য। 

মানিক দশগ্রামের নামডাক অলা সেরা ছাত্র বৃত্তি পরীক্ষায় বিভাগীয় প্রথম হয়। তার পর থেকেই নানা সাফল্যের ঝুলি বয়ে এনেছ করিম মিয়ার ভাঙ্গা কুড়ে ঘরে। মানিক যেন সবার আদরের মানিক, হৃদয়ের মানিক। জোনাকির আলোয় চোখ ঝলসে যায়। শহরের ধসে লাল নীল হলুদ বাতির আড়ালে সে সবুজটাকে কখন যেন কীভাবে ভুলে যায়। 

পর্দায় ফুটে ওঠা রূপালি ছবির আড়ালে সবুজ শ্যামলিয়া ঢাকা পড়ে যায়। গলিপথের দিকে তখনই কিছু সমাজ সেবী নেতা তার হাতে তুলে দেয় অস্ত্র ও মাদক। এই সমাজ সেবী নেতারা ছিল মুখোশধারী। কিছু বন্ধুও জুটে যায় তার। পাট ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে লকলক করে ওঠা কচি পাতার ডগা দেখে মনটা ভরে ওঠে করিম মিয়ার।  

পাঠ ও তার মানিক বেড়ে উঠেছে আগামীর সহায় হয়ে। হঠাৎ একদিন ইংরেজি কাগজে কি সব লেখা চিঠি আসল করিম মিয়ার কাছে। চিঠিটা নিয়ে তখনই ছুটলো সিরাজ স্যারের কাছে। সিরাজ স্যার তো দেখে স্তম্ভিত। মানিক কিনা ফেল করেছে প্রায় সব বিষয়ে। কিন্তু, তিনি করিম মিয়াকে কিছু বলেন না। বলেন যে, মানিকের শরীর খারাপ তাই সে পরীক্ষা ভালো দিতে পারেনি কিন্তু তাতে মন মানে নি করিম মিয়ার। রাতে কিছু টাকা পয়সা ধার-দেনা করে রওনা হয় শহরে। 

দুপুরের দিকে সে মানিক যে হোস্টেলে থাকে ঐ খানে পৌঁছায়। ঐখানে পৌঁছে সে একজনকে জিজ্ঞাসা করে ‘‘এই যে বাবা, মানিক নামে একটা ছেলে থাকে না, খুব ভালো ছেলে।’’ ছেলেটা বলে –‘‘কোন মানিক? নেশাখোর মানিক? এর জন্য পুরো কলেজ নষ্ট হতে চলেছে।’’ করিম মিয়া বলে, না বাব, তুমি বাধ হয় ভুল করছ। বহু জিজ্ঞাসাবাদের পর করিম মিয়া মানিকের ঘর খুজেঁ পায়। ঘরে ঢুকে স্তম্ভিত হয়ে যায় সে। মেঝেতে পড়ে আছে মানিক। বইপত্র এখানে সেখানে ছাড়ানো। মেঝে ও টেবিলে মদের বোতল রাখা। বাবাকে দেখেও যেন চিনতে পারে না সে। করিম মিয়া কেঁদে ওঠেন, ‘‘মানিক’’। মানিক বলে, তুমি ঠিক সময় এসেছ বাবা। ও’রা না আজ ক’দিন ধরে আমাকে মদ হেরাইন কিছুই দিচ্ছে না। তুমি ক’টা টাকা দেও না বাবা। 

কোথায় মানিকের সেই বুক জুড়ানো বাজান ডাক! এ কোন মানিককে দেখছে সে। স্পর্শ করতে গিয়েও ছিটকে বেরিয়ে আসে করিম মিয়া। রাস্তায় নেমে পড়ে গন্তব্যহীন পথে হাঁটা শুরু করে সে। কিছুদূর এসে ঝরঝর করে সে কেঁদে ফেলে। হঠাৎ করিম মিয়ার মনে হলো যে কে তার বুকের মানিককে গুন্ডা মানিকে পরিণত করল? চিৎকার করে বলল, আমার মানিককে কে কারা কেড়ে নিল? আমার বুকের মানিককে শেষ করে দিল কে? কে? কে? আমি বুঝেছি আমার বুকের মানিককে হারিয়ে। আপনারাও বুঝবেন আপনার বুকের মাইেশ যেদিন হারাবে। কিন্তু হায়! কিন্তু শহরের ইট, কাঠ, কংক্রিট নির্মিত দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে সে শব্দ শহরের পাষাণ হৃদয় স্পর্শ করল কিনা কে জানে? কিন্তু, বৃদ্ধ করিম মিয়ার কথাটি প্রতিফলিত হতে থাকল, আর কত মানিক ধ্বংস হয়ে যাবে, আর কত? আর কত?........


**শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের সাময়িকী "কুঞ্জলতা" তে প্রকাশিত।  

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

Blogger দ্বারা পরিচালিত.