অসমাপ্ত
ষড়ানন চাকমা:
১.
"এই চশমিস, তুই এতো বাচাল কেন?"
"কি বললি? গাধারাম আলু, যাহ তোর সাথে কথা নাই"
"রাগ করলি, নীলু সোনা?"
" সোনা!!! ওই আমি কি ধাতু??"
"না মানে তুই ধাতু হবি কেন?"
"তাইলে সোনা বলিস কেন?"
"এমনি"
আকাশ আর নীলার মধ্যে এমনি খুনশুটি চলে। তারা একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ তে পড়ে। আকাশ একটু দেখতে মোটা বলে নীলা আলু বলে তাকে খেপায়। যদিও নীলা বললে আকাশের খারাপ লাগে না, কিন্তু অন্য বন্ধুরা ডাকলে ভীষণ রেগে যায়। আর নীলা চোখে চশমা দেয় বলে আকাশ চশমিস বলে খেপায়। আকাশ আর নীলার বন্ধুত্বটা এতোই গভীর যে, তাদের ক্লাসের সবাই মনে করে তারা প্রেম করে।
আজ ক্লাসে নীলা আসেনি। আকাশের তেমন ভালো লাগছে না। নীলার ফোনে চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু মোবাইলের যান্ত্রিক কন্ঠ বলছে, ‘আপনি যে নম্বারে ডায়াল করেছেন সেটি বন্ধ.. ..’ তাই আকাশ নীলার আর একজন বন্ধু হেমার কাছে জিজ্ঞাসা করল ,
"এই হেমা, নীলু কই? আজ আসলো না যে?"
হেমা বলল,
"জানি না রে, সম্ভবত কোথাও বেড়াতে গেছে।"
আজ আকাশ কোন ক্লাসেই মনোযোগী হতে পারলো না। মনে হচ্ছে সে কিছু একটা হারিয়েছে, সে বুঝতে পারছে না নীলা কেন তার ফোন বন্ধ রেখেছে। উদাস হয়ে গেলো আকাশ। তাকে তার বন্ধুরা এর কারণ জানতে চাইলে বলল,
"আরে কিছু না, তোরা যা। আমাকে একা থাকতে দে।"
বন্ধুরা বলে,"সব বুঝি, নীলা আসে নাই তো তাই .."
কি! নীলার আসা না আসা নিয়ে আমার কি আসে যায়? তোরা কি এখন যাবি?
ঠিক আছে বন্ধু, যাচ্ছি।
আকাশকে তার বন্ধুরা নীলার কথা বললে কেন যে রাগ হয় আকাশের তা আঝো বুঝে উঠতে পারেনি।
এক সপ্তাহ পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নীলার আগমন। নীলাকে দেখে আকাশের মন যেন খুশিতে ভরে উঠলো। কিন্তু নীলাকে কেমন যেন লাগছে।
আকাশ, "কিরে চশমিস? এতোদিন কই গায়েব হইছিলি? কি হয়ছিলো?"
কই? কিছু তো হয়নি (নীলার কন্ঠে গাম্ভীর্য)
মিথ্যা বলস ক্যান? আজ এক সপ্তাহ ধরে তোর ফোন বন্ধ। ক্যান?
ঐ তোর সমস্যা কি? এটা আমার ইচ্ছা ফোন বন্ধ রাখি, না রাখি। তুই বলার কে?
(একটু রেগে) না কিছু না। দুঃখিত।
আকাশ বুঝতে পারলো না হঠাৎ নীলার কি হলো! নীলার মধ্যে কেমন একটা গাম্ভীর্য চলে এসছে। আকাশ কিছুতেই বুঝতে পারছেনা। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কথা হলো না। বিকালে বাসায় গিয়ে আকাশ নীলাকে নিয়ে ভাবতে লাগলো। এমন সময় নীলুর ফোন।
আকাশ - হ্যালো।
নীলা - দোস্ত, আমি দুঃখিত।
দুঃখিত, ক্যান?
ক্লাসে তোর সাথে এমন করা উচিত হয়নি।
আরে আমি কিছু মনে করিনি।
কিন্তু তবুও, পারলে মাফ করে দিস।
কিরে নীলু? তোর আবার কি হলো? কি? যেখানে আমি তোকে মাফের কথা বললে আমার উপর রাগ করিস আর সেই তুই আজ মাফ চাইলি ! মানে কি?
কিছু না রে, তোর সাথে কথা আছে!
বল। না
ফোনে বলবো না।
তাহলে?
কাল তো ক্লাস অফ! এককাজ কর কাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের কফি শপে আমার জন্য অপেক্ষা করিস।
কখন?
বিকালের দিকে।
আচ্ছা।
২.
নীলাকে তার মা জানালো যে এক সপ্তাহের জন্য তাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। আর গ্রামে নেটওয়ার্কের কথা চিন্তা করতেই নীলার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সেখানে নেটওয়ার্কে সমস্যা। নীলা ভাবলো এক সপ্তাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস মিস হবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা আকাশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কি করে থাকবে? নীলা মা কে বললো,
'মা, না গেলে হয় না ?'
মা, "না, তোকেই বেশি দরকার"
নীলা, 'কেনো?'
মা, "এতো কিছু জিজ্ঞাসা করিস না, যা বলসি তাই কর"
নীলা, "আচ্ছা।"
গ্রামে গিয়ে নীলা জানতে পারে আসলে গ্রামে তার জন্য বিয়ে ঠিক করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জামাই অবশ্য গ্রামের হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থে অনার্স- মাস্টার্সে ভালো ফলাফল করে এখন ভালো একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। নীলাকে দেখে জামাই এর খুব পছন্দ হলো। পছন্দ হওয়ারই কথা। নীলা দেখতে বেশ সুন্দরীই আর চোখের চশমার জন্য নীলাকে আরো সুন্দর লাগে। নীলারও পছন্দ হয়। কিন্তু নীলার আকাশের কথা বারবার মনে উঠতে থাকে। ইচ্ছা করছে আকাশকে সব বলতে কিন্তু মোবাইলের নেটওয়ার্কের কারণে পারে না । বিয়ের দিন তারিখ সব ঠিক হয়ে যায়। আগামী এক মাসের মধ্যেই বিয়ে। নীলার বিয়ের প্রতি কোন মনোযোগ নেই। সে শুধু আকাশের কথাই ভেবে চলেছে।
৩.
আকাশ বিকাল ৩ টার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের কফি শপে চলে আসছে। নীলাকে ফোন দিয়ে বলেছে যে সে চলে আসছে। নীলাও আসচ্ছি বলে ফোন রেখে দিলো। আকাশ মনে মনে ভাবছে, আজ নীলাকে মনের কথা গুলো বলে দিবে। নিজের অনুভূতি, এই সেই যা আছে সব। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলে নীলা কফি শপে ঢুকছে। নীলাকে দেখতে আজ খুব সুন্দর লাগছে। বেশ মানিয়েছেও। আকাশী রং-এর শাড়িটাতে।
নীলা, "কিরে আলু, এমনে হা করে কি দেখিস?
নীলার কথাই আকাশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো এবং বলল,
"না মানে ইয়ে........" কি? তোকে আজ খুব সুন্দর মানিয়েছে।
তাই বুঝি?
হুম।
মনে আছে এই শাড়িটা তুই পছন্দ করে দিছিলি?
ও হ্যাঁ। তাই তো বলি শাড়িটা চেনা চেনা লাগে কেন?
হাদারাম কোথাকার!
হুম। আচ্ছা বল কি জন্য ডাকছস?
তার আগে বল, তুই এমনে সাজগোজ করে আসছস ক্যান? কাউকে “প্রোফোজ” করবি নাকি?
আরে না এমনিই। (মনে মনে ভাবে, এই পাগলিটা কি করে বুঝলো ব্যাপারটা !!)
ও। আমি এই এক সপ্তাহ কোথায় ছিলাম জানিস?
না তো। কোথায়?
গ্রামে
গ্রামে!!!! এই অসময়ে?
আসলে হয়েছেটা কি, ইয়ে তোকে যে কি করে বলি।
আরে বল সমস্যা নাই।
মানে আমার বিয়ে ঠিক করার জন্য নিয়ে গেছিলো।
বিয়ে??
হুম বিয়ে।
ও। বর কি করে?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
ওহ আচ্ছা। Congratulation. তুই.......... কি? কিছু না। ও কবে বিয়ে?
অইসব বাদ দে।
ক্যান?
ভালো লাগে না। ও জানিস আমি এই এক সপ্তাহ তোকে প্রচুর মিস করছি। যখন বিয়ের কথা হচ্ছিল তখনো জানি না কি হয়েছে আমার। তোর ও কি এমন হয়?
ক..ক...কই না তো?
মিথ্যা বলছিস?? তুই জানিস আমি মিথ্যা পছন্দ করি না।
আ..আ..আমি মিথ্যা বলবো কোনো?
দেখ, ভালোভাবে বলতাছি কিন্তু।
হুম, আমারো এমন হয়। সবসময় তোর সাথে কথা বলতে মন চায়, দুষ্টামি করতে মন চায়।
এতোদিন বলিস নি ক্যান?
ভয়ে।
এখন বলে কি হবে?
জানিনা।
চল পালিয়ে বিয়ে করি।
না রে, তোর লাইফটা নষ্ট হোক আমি চাই না। তুই তোর ঐ শিক্ষক কেই বিয়ে কর।
তোর লাইফটা বুঝি নষ্ট হবে না, তখন?
আরে আমার কথা বাদ দে। আমার যা হবার হবে।
কিন্তু আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তোকে যে ভালোবাসি।
ভালোবাসলে সব কিছু পাওয়া যায় না। তোকে সুখি দেখলেই আমি খুশি হবো।
কিন্তু.....
কোন কিন্তু না। তুই বিয়ে কর।
না, আমি তোকেই বিয়ে করবো।
তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকিস তাহলে সেই ভালোবাসার কসম তুই ঐ শিক্ষক কেই বিয়ে কর।
না, পারবো না, প্লিজ এমন বলিস না!
নীলা কেঁদে ফেলে...আকাশের চোখও লাল হয়ে যায়। কিন্তু কোনো রকমে কান্নাকে থামানোর চেষ্টা করে। মুখ দিয়ে দুইজনই কিছু বলতে পারে না। অতঃপর নীলার বিয়ে হয়ে যায় সেই শিক্ষক বরের সাথে। এদিকে আকাশ বিবিএ শেষ করে এমবিএ করার জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে যায়।
আজো কোনো কারণে সেই কফি শপের পাশে গেলে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় গেলে মনের ভিতর এক অজানা শূণ্যতা ভর করে নীলার মনে। যে শূণ্যতা সে বয়ে নিয়ে চলছে সারা জীবন .. .. ..
**শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের সাময়িকী "কুঞ্জলতা" তে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই
মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।