Header Ads

Header ADS

রং



আলিমুল রাজি : প্রকৃতির শিল্পীর সাধ জাগল। তৈরি হল লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সাদা বাহারি রং। এরপর বানানো হল গোলক। তাতে ফসলের উদারতা, নদীর ব্যস্ততা, বনের প্রশান্তি, পাহাড়ের দম্ভ ঠিক ঠাক সাঁটানো। অতঃপর জারি হল ফরমান রংগুলো গোলকে অবাধ বিচরণ করবে । সবার উপরে শ্রেষ্ঠ তারা।

অতঃপর....শহরের সবটা লাল, নীল, হলুদ, সবুজ নানা বর্ণের দখলে। আর উচ্ছিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকা ফাঁকা জায়গাগুলো বর্ণালীদের হেফাজতে। বর্ণালীরা বিশেষ ক্ষমতাধর। তাদের রয়েছে রং বদলানোর ক্ষমতা। সময়ে তারা রং বদলায় । জলপাই আর নীল-কালোরা তাদের নিরাপত্তায় থাকে। ছবি আঁকতে কালির গুরুত্ব অনেক। ভালো ছবিতে যেমন কালির ব্যবহার থাকে নিপুণ তেমনি ফাঁকা কাগজেও থাকে মুরশিয়ানার ছোঁয়া। প্রকৃতির শিল্পী বর্ণহীনদের ঠায় দিয়েছেন নগরের ফুটপাতে নয়তো পার্কে।

বর্ণহীন রাব্বিদের বসবাস উদ্যানে উদ্যানে। সূর্যালোকে তারা বোতল আর পাইপ কুড়ায়। চাঁদ জাগলে আশ্রয় নেয় পলিথিন তাবুতে। স্বপ্ন দেখে রং মাখার। মাঝে মাঝে স্বপ্নও এসে ধরা দিতে চায়। স্বপ্ন আসে রঙিন মানুষদের কাঁধে চড়ে। রং চড়াতে চায় রাব্বিদের গায়ে। ছবি উঠে পত্রিকায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সরব হয় নানা দাবিতে। ছিন্নমূলদের অধিকার চায়। লাল পতাকা ধারীরা সেøাগান দেয়-কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না, তা হবে না। কত আয়োজন! শুধু রং উঠে না রাব্বিদের গায়ে। অধিকার চাও, আন্দোলন কর। অধিকারের আন্দোলনে রাব্বিরা বিশেষ দক্ষ। ইট, পাটকেল, ককটেল থাকে রাব্বিদের দখলে। রঙিনদের কাছ থেকে পাওয়া অবহেলাগুলোর জবাব দেবার সুযোগ আসে-মনের আনন্দে পাথর ছুড়ে তারা। রাব্বি এই দলের নেতা।

বর্ণহীনদের মাঝে রঙিন আসমানি-সবুর মিঞার মেয়ে। মাতামাতি করেই দিন কাটছিল। বাধ সাধল সবুর মিঞার দুরারোগ্য। ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে। অপারেশন মানে টাকা। মা মরা আসমানি নিরুপায়। সুরুজ আসমানিদের প্রতিবেশী। মিশুক স্বভাব তার। প্রতিদিন সবুর মিঞার খোঁজ খবর নেয় সে, সঙ্গে আনে পান আর সিগারেট। বয়স আসমানির চেয়ে বছর দশেক বেশি। সবুর মিঞা প্রায়শই তার প্রশংসা করে বলে-কামের পোলা।

ছেলেবেলা থেকে আসমানি আর রাব্বির এক সাথে বেড়ে উঠা। বোতল কুড়ানো, ঝিলের শাপলা তোলা সবখানে প্রতিদ্বন্ধী তারা। ছেলে বেলা থেকে কেবল জিততেই চেয়েছে রাব্বি। আজকাল হেরেও মজা পায়। হেরে মুখ ভার করে থাকে। আসমানির তাতে আনন্দের শেষ থাকে না। এ আনন্দে রাব্বিও শামিল হতে চায়। কিন্তু হারার অভিনয়টা নিপুণ হওয়া আবশ্যক। অতি লোভে শেষে আনন্দই না শেষ হয়ে যায়।

সবুর মিঞার রোগ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ডাক্তার দ্রুত অপারেশন করাতে চায়। প্রয়োজন টাকার। আজকাল ভিক্ষা করে খুব বেশি টাকা মিলে না। তাছাড়া রাব্বির এটা পছন্দ নয়। নিরুপায় আসমানি সুরুজের পরামর্শ চায়। অল্প সময়ে নগদ অর্থের একটা পথ দেখে আসমানি। রঙিন মানুষদের রাঙাতে রং হতে হয় তাকে। কাজটা সবুর মিঞার রোগ ভাল হবার আগ পর্যন্ত। তাছাড়া সবকিছু গোপন রাখবে বলে কথা দিয়েছে সুরুজ।

দৃশ্যটা ছবির হাটের। নানা রঙের ছড়াছড়ি-বাহারি রং আনন্দ ছড়ায়, আনন্দ খুঁজে। গিজগিজ করে পরিবেশ। আনন্দ খুঁজার ব্যস্ততা। কিন্তু আজ ব্যস্ততা নেই। বৃষ্টি ভেজা বিকেল। পাতায় পাতায় জল বিনিময়। ধুয়ে দেয় একে অন্যকে। রাব্বিও আজ বাঁধা মানবে না। সকল আবেগ দিয়ে ছুঁয়ে দিবে আসমানিকে। দেহের পিছনে আড়াল করে ধরা গোলাপটা সামনে বাড়িয়ে বাহিরে আনবে হৃদয়ের আবেদন। একীভূত হবে দুজনে। আজকাল আসমানিকে কাছে পাওয়া যায় না। দূরে পালাতে চায় যেন। সুরুজের সাথে মেলামেশাও ভাল লাগে না তার।

আসমানি জানে কি বলতে চায় রাব্বি। রাব্বির চোখের ভাষা পড়তে পাওে সে। রোমাঞ্চ ছুয়ে যায় আসমানির মনে। বিগত দিনগুলো বার বার তাকে রাব্বির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আজ তবে সকল দূরত্ব দূর হোক না।

সহজ কথাটা সহজে কি বলা যায়। কত কথায় তো হয়েছে অতীতে। আজ কেন যেন স্বও থেমে যেতে চায়। যা হোক পরিস্থিতি সহজ করা যাক। কিন্তু কি বলবে রাব্বি ? চারদিক কতগুলো নারীর আনাগোনা। তাদের মুখে ম্যাকাপ বক্সের ভারী রঙের ছোঁয়া। রাব্বির চোখ যায় তাদের দিকে। কি বিশ্রী মাইয়া। তাই না আসমানি। ট্যাঁকা লাগেেবা, অন্য কাম কর। দুনিয়াই কি কামের অভাব আছে। তাই বলে ছিঃ.........। আসমানি নিরুত্তর। এরপর আরো দু-চার কথা বলল রাব্বি। আসমানির মুখে কথা আসে না। অস্থিরতা বাড়ে রাব্বির মনে। মনে মনে ভাবে কি বলবো আর বলছি কি। কথাটা বলেই ফেলা যাক। গোলাপটা সামনে বাড়ায় সে। আসমানি আমি তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি। দিনে রাইতে শুধু তোরে ভাবি। আসমানি নিরুত্তর। ভেবে কুল পায় না রাব্বি। অবশেষে নিরবতা ভাঙে আসমানি। গলায় জোর সঞ্চার করে বলে-সুরুজ ভাইরে আমার অনেক ভালো লাগে। আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রাব্বির মাথায়। আসমানি কাঁদতে চায়। বৃষ্টি তাকে সে সুযোগ দেয় না। বৃষ্টির জলের মাঝে তার চোখের জলটুকুন প্রকাশ পায় না। শিল্পী সব সময় কাগজের কিছু অংশে রং ভরাতে চায় না। ফাঁকা থেকে যায় সব সময়।  



**শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের সাময়িকী "কুঞ্জলতা" তে প্রকাশিত।

২টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লেখা। বেশ ভালো লাগল। এরকম আরো লেখা চাই। ধন্যবাদ শেকৃবি সাহিত্য সংসদকে এত সুন্দর ওয়েবসাইট খোলার জন্য।

    উত্তরমুছুন

মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

Blogger দ্বারা পরিচালিত.