Header Ads

Header ADS

রক্তের বন্ধন

 

রক্তের বন্ধন

-মো. শাহীন আলম 


ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরিই হয়েছে । ঘুম থেকে উঠে দেখি ফোনে একটা মিসড কল।স্বভাবতই কল ব্যাক করলাম। ও পাশ থেকে কেটে দিয়ে কল ব্যাক করছে। ধরতেই ওপাশ থেকে“ আসসালামু আলাইকুম ভাই,আমি আব্দুল্লাহ। ”
“ওলাইকুম আসসালাম”
“কেমন আছেন?  আমারে চিনছেন?”
কন্ঠটা একটু চেনা চেনা লাগে কারও সাথে মিলাতেও পারছি না। লোকটা এত পরিচিত এর মত কথা বলছে, আমি চিনতে পারছি না।
লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “ভাল, নাম্বার সেইভ নাই তো... ”
“ওই যে আমার ছেলেরে ব্লাড দিছিলেন, বাড়ি রংপুর ”

বলতেই মনে পড়ে গেল, প্রায় এক বছর আগের কথা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে থাকতাম। প্রতিদিনই অনেক রাত করে ঘুমাতে যাইতাম। সকালেও উঠতাম অনেক দেরি করে, প্রায় দিনই সকালের নাস্তা হত না। এখনও অবশ্য নাস্তা করা হয় না৷ সেই দিন সম্ভবত ক্লাস ছিল না৷ কে যেন ডেকে বলল “ওঠ, এক লোক ব্লাডের জন্য আসছে, তোর না O+ ”
একটু পর ঘুম থেকে উঠে চোখ মুছতে মুছতে গণরুমের  বাইরে আসলাম।দেখলাম একজন  খাট ,কাল, সামান্য মোটা এটা অবশ্য খাটো হওয়ার কারনেই মোটা লাগে।

প্রথমেই লোকটা বলল“ভাই,আপনার O+ ব্লাড? ”
“হুম ”
“আমার ছেলের O+ ব্লাড দরকার, আধা পাউন্ড হলেই হবে।বাচ্চা তো। ”
ব্লাড দেওয়ার পর চার মাস হয়ে গেছে তাই আমিও না করলাম না।
বললাম “আচ্ছা, আমি নাস্তা করে নেই।”
অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বলল “আচ্ছা ভাই যান, আমি বসি ”

নাস্তা করে এসে এক বন্ধুরে সাথে করে ব্লাড দিতে গেলাম। পথে যাইতে যাইতে অনেক কথা হল । কথার সারাংশ এমন, তার বাড়ি রংপুর। সেখানে একটা প্রেস আছে। বিয়ে করছে বেশি দিন হয়নি। একটি ছেলের বাবা হয়েছে। তার একমাত্র  ছেলের জন্মের পর পরই হার্টে ফুটা ধরা পরে। প্রথমে রংপুর মেডিকেলে নিলে পরবর্তীতে হৃদ রোগ ইনিস্টিউট ট্রান্সফার করে। সে একাই বিভিন্ন দরকারে দৌড়াদৌড়ি করছে। তর স্ত্রী অতিরিক্ত সহজ সরল গ্রামের মেয়ে বলে শহরের কোন কিছুই সে এত ভাল বোঝে না।
যা বুঝলাম,খুব বেশি শিক্ষিত না হলেও খুব শুদ্ধ ভাবেই কথা বলতেছিল।
সে বলতেছে ,“ ভাই,আমার ছেলেডারে একটু দেইখা যাবেন । ”
জিগ্যেস করলাম, “ ছেলের অপারেশন কবে? ”
“কিছুদিন পর, ডাক্তার বলছে দ্রুত অপারেশন করতে,বড় হলে আরও বেশি খরচ হবে এবং ঝুঁকি ও বাড়বে। তবুও এখন অপারেশন করাইলেও ফিফটি ফিফটি চান্স। দোয়া করবেন। ”
“অবশ্যই,  কত টাকা দরকার? ”
“দেড় লাখ টাকার বেশি,সব কিছু বিক্রি কইরা আনতে কইছি” বউয়ের দিকে নির্দেশ দিয়া বলল “ওর, বাপের বাড়ি থিকাও কিছু টাকা দিব।”
এত টাকা যোগাতে অনেক কাঠ খড় পোহাতে হচ্ছে।
“আরও রক্তও লাগব অপারেশন এর সময়.।”
“সমস্যা নাই, রক্ত লাগলে আমারে ফোন দিয়েন?”
আমার নাম্বার রেখে দিল, তার একটা কার্ড দিল  বলল“রংপুর আমার বাসায় যাবেন একবার। ওই দিকে গেলে একবার ফোন দিবেন, দয়া করে।
নিয়ম রক্ষার্থে বললাম “যাব, ইনশাআল্লাহ ”
বলল “ বড় বড় অসুখ গরিব মানুষেরই হয়। ”
আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না
রক্ত দিয়ে আসলাম ।
কিছুদিন পর ফোন দিলে, সাধারণ কথাবার্তা হল। অপারেশনের কথা জিগাইলেই বলল, কিছুদিন পর অপারেশন করবে। রক্ত লাগলে ফোন দিয়েন বলে রেখে দিলাম ।
এরই মধ্যে বছর চলে গেল । আমিও আর ফোন দেইনি। কতজনকেই তো রক্ত দিলাম। কে কার খোজ রাখে।
বছর খানেক পরে আজকে আব্দুল্লাহ নামক লোকটার সাথে ফোনে কথা হল।

এপর্যায়ে আমি বললাম “চিনেছি, ভাই।  আপনি কেমন আছেন? ”
“ভাল। কোথায় আছেন? ”
“ ভার্সিটিতেই। ও আপনার বাচ্চার কি অবস্থা? ”
হঠাৎ করে একটু সময় নিয়ে বলল “ ছেলেটা মারা গেছে। ”
হঠাৎ একটু আঘাত পেলাম।
“কবে?”
“মাস চারেক আগে”
“ অপারেশন করান নাই? ”
“না ”
“কেন?” কিছুটা বিস্মিত হয়ে।
“টাকা পয়সা সব জমা দিছিলাম। হাসপাতালে ভাইরাস সংক্রমণ হইছিল । তাই বাড়িতে চলে আসতে বলছিল। যখন হাসপাতাল ঠিক হয় তখন নিয়ে যাইতে কইছিল। ”
“পরে কি হইল? ”
“ তখন ই তো শ্বাস কষ্ট ছিল। তাই একটা অক্সিজেনের সিলিন্ডার সহ বাড়িতে নিয়ে আসছিলাম।  তার কিছুদিন পরে শ্বাসকষ্ট উঠে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই ছেলেডা আমার মারা যায়। ” আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। এখনই হয়ত কেঁদে ফেলবে।
আমি বলার ভাষা হারিয়ে ফেলছিলাম। কারণ একমাত্র ছেলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাচাঁতে পারি নি। ছেলের মৃত্যু বাবার জন্য খুবই কষ্টকর। কথায় আছে, বাবার কাধে সবচেয়ে ভারি বোঝা হচ্ছে সন্তানের লাশ।
আমি সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বললাম “ আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করেন, মন খারাপ কইরেন না।”
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আবার আর্জি করে, ”ভাই,রংপুর বেড়াতে আসবেন কিন্তু। ”
একই উত্তর “যাব ইনশাআল্লাহ.।”

আত্মার সম্পর্ককে আত্মীয় বলে, রক্তের মাধ্যমে সম্পর্ককে কি বলে?






কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

Blogger দ্বারা পরিচালিত.